দেশজুড়ে নৌপথেও চলছে লাগামহীন চাঁদাবাজি। সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র এই চাঁদাবাজিতে সক্রিয়। মেঘনা থেকে পদ্মা, শীতলক্ষ্যা হয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই চাঁদাবাজদের অপতৎপরতা। নৌপথে পণ্যবাহী নৌযান টার্গেট করে এরা চাঁদাবাজি করছে।
সূত্র জানায়, দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন স্থানে নোঙর করা নৌযান থেকে রাতে এবং দিনের বেলায়ও চাঁদাবাজি করছে। এর কিছু ঘটনায় মামলা হলেও বেশির ভাগ ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। ফলে ধরা পড়ছে না অপরাধীরা।
বর্তমানে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের নামে নৌপথে বেশি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। চাঁদাবাজির শিকার নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে ভীতি কাজ করছে।
নৌ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌপথে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না। ফলে চাঁদাবাজদের হাতে একপ্রকার জিম্মি তারা।
জানতে চাইলে নৌ পুলিশের (ঢাকা অঞ্চল) পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নৌপথে সক্রিয় অপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এতে জড়িতদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সদরঘাটসহ চাঁদপুর, শরীয়তপুর ও নারায়ণগঞ্জে নৌপথের বিভিন্ন স্থানের শ্রমিকরা চাঁদাবাজির অভিযোগ করছেন। এসব জেলার ওপর দিয়ে মেঘনা ও পদ্মা নদী প্রবাহিত।
এই দুই নদী দিয়ে দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রামের যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌযানে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করা হয়। এই দুই নদীর অসংখ্য সীমানায় রয়েছে চর ও ডুবোচর। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, মোংলা বন্দর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় চলাচল করে দেড় হাজারের বেশি মালবাহী জাহাজ ও সহস্রাধিক বাল্কহেড। এসব জায়গায় রাতে ও দিনে চাঁদাবাজি অব্যাহত আছে।
নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ষাটনল, চরভৈরবী, মল্লিকপুর, ইলিশা ও দড়রচর এলাকার সব ধরনের নৌযানকে চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া শরীয়তপুরের চর আত্রা, ওয়াপদা, বাবুরচর, খাজুরতলা ও পাইনপাড়া এলাকায় ট্রলার নিয়ে দুর্বৃত্তরা চাঁদাবাজি করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে করে এসে দুর্বৃত্তরা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করে। চাহিদামতো চাঁদা না দিলে করা হয় মারধর। এসব ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে জানিয়েও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
তবে কিছু এলাকা থেকে চাঁদাবাজচক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে নৌ পুলিশ। নৌ পুলিশ বলছে, গত ১১ আগস্ট সিলেটের গোয়াইনঘাটে নৌপথে চাঁদাবাজি মামলায় সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী আজমল হোসেনসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৯। পরে তাদের গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আজমল জানান, তিনি নৌপথে একটি গ্রুপের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন।
পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে, গত বছর ৫ আগস্ট-পরবর্তী জুলাই-আগস্টের সমন্বয়ক হিসেবে তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন সুলতান আহমদ, মো. বিল্লাল, মো. সুবহান, শাকিল, ফারুক মিয়া ও ফয়সাল মৌলভি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে র্যাব জানায়, আজমলের নেতৃত্বে একটি দল নৌপথে নৌকা ও বাল্কহেড আটকে রেখে চাঁদাবাজি করত। এমন অভিযোগে সিলেটের গোয়াইনঘাট থানায় মামলা করেন উপজেলার সদর ইউনিয়নের আব্দুল আলিম নামের এক ব্যক্তি।
কোস্ট গার্ড সূত্র বলছে, এর আগে গত ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি লাইটার জাহাজ চাঁদপুর মোহনাসংলগ্ন এলাকায় নোঙর করলে সাত সদস্যের একটি চাঁদাবাজদল সেখানে চাঁদা দাবি করে। তাদের ধরতে বর্তমানে অভিযান চলছে।
এদিকে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ সীমানায় শীতলক্ষ্যা নদীপথে প্রকাশ্যে মালবাহী নৌযানে চলছে চাঁদাবাজি। মালবাহী জাহাজসহ চাঁদাবাজদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ছোট ট্রলারও। প্রতিটি নৌযান থেকে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নৌযানের শ্রমিক ও চালকদের মারধর এবং মালপত্র লুট করে নেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে বিভিন্ন সার কারখানা, সুগার মিল, জুটমিল, পেপার মিল, সিমেন্টসহ বড় বড় শিল্প-কারখানার বেশির ভাগ পণ্য ও কাঁচামাল আনা-নেওয়া করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, চাহিদামতো চাঁদা না পেলে হামলা ও লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া নৌপথ দিয়ে চলাচল করা বালু, বাঁশ, পাথরসহ বিভিন্ন মালবাহী ট্রলার আটকে চাঁদা আদায় করে চাঁদাবাজরা। শীতলক্ষ্যা নদীপথে নিয়মিত যাতায়াত করা ট্রলার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে সারসহ অন্যান্য মালপত্র নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর ডাঙ্গা-কালীগঞ্জ সীমানায় পৌঁছলে পেছন থেকে ট্রলার নিয়ে দুর্বৃত্তরা এসে জাহাজের স্টাফদের মারধর করে চাঁদা দাবি করে।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)
সূত্র: কালের কন্ঠ
সময়ভেলা/জাতীয়



সময় ভেলা রিপোর্ট