কোন ভুলে শেখ হাসিনা আজ ভারতে পলাতক?
-
আপলোড সময় :
০৬-০৭-২০২৫ ০৩:২৩:৫৪ অপরাহ্ন
-
আপডেট সময় :
০৬-০৭-২০২৫ ০৩:২৩:৫৪ অপরাহ্ন
প্রতিকী ছবি। ( গ্রাফিক্স )
টানা ১৫ বছরের বেশি সময় বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় থাকার পর গত ১১ মাস ধরে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ৫ হাজার ৬৯০ দিনের শাসন শেষে ছাত্র ও জনতার গণআন্দোলনের মুখে দেশ ত্যাগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের কয়েক মাস পরই শুরু হয় কোটা সংস্কার ঘিরে আন্দোলন। আন্দোলনের বিস্তার, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো পরিস্থিতিকে ক্রমেই জটিল করে তোলে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সরকার যখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পেছনে অবস্থান নেয়, তখন থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রকট হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর ছাত্রলীগের হামলা এবং সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বক্তব্য উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়, বিশেষত রাজাকারদের নাতি-পুতিদের প্রসঙ্গ তুলে ধরার বক্তব্যটি। এই বক্তব্যের পরপরই সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনে প্রতিবাদ শুরু হয়।
বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরের শিক্ষার্থী আবু সাইদকে গুলি করে হত্যার পর আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করে। ঢাকার রাজপথে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন রাস্তা অবরোধ করে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। গণপরিবহন, সরকারি কর্মকাণ্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থবিরতা নেমে আসে।
ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে প্রকাশ্য সমর্থন পাওয়া ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের একটি অংশ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মী দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন।
এর মধ্যে আলোচনায় উঠে আসে ডিবি পুলিশ হারুন অর রশিদের ভূমিকা। আন্দোলনের অন্যতম ছয় সমন্বয়কারীকে তুলে নেওয়া এবং তাদের জোর করে বিবৃতি দিতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা হলে তা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে নানা সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে গণতন্ত্রের চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দমন, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে। বিরোধী দল ও বিশ্লেষকরা বহুবার অভিযোগ করেছেন, সরকার প্রশাসন ও দলকে এক করে ফেলেছে এবং ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে।
শেখ হাসিনার ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এক তরফা নীতি, বন্ধুহীন কূটনীতি, এবং পারিবারিক তোষণসহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার দীর্ঘ শাসনকালে।
আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ৬ জুলাই ছাত্ররা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। ১৬ই জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের উপর ছাত্রলীগ হামলা চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তবে দেশের মানুষ বেশী প্রতিবাদী হয়ে ওঠে আবু সাঈদের মৃত্যুতে। সারাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরপর ১৮ জুলাই থেকে সারাদেশে নেট বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে চলে যায়। ছাত্র-জনতা সকলে মিলে রাস্তায় নেমে পরে সেই সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ১৮ জুলাই থেকে ৪ই আগস্ট পর্যন্ত বহু শিশু ও সাধারন জনগন প্রান হারায় এই আন্দোলনের জন্য।
অবশেষে ৫ আগস্ট দুপুর আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা সামরিক হেলিকপ্টারে করে গণভবন ত্যাগ করেন। দেশ ছাড়ার আগে তিনি জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ জানালেও তা অনুমোদন পায়নি।
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ জামান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। একটি অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত গঠনের প্রস্তুতি চলছে। আমরা দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করছি, শিগগিরই শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে।
এছাড়া তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন করে কারফিউ বা জরুরি অবস্থার প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি।
দেশত্যাগের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তার ছোটবোন শেখ রেহানা। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গণভবনে প্রবেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। একই দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
তিনি বলেন, জনগণ ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্ব। এক মিনিটের জন্যও কোনো অনির্বাচিত সরকার যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে, তা নিশ্চিত করুন।
১৯৮১ সালে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন শেখ হাসিনা। এরপর ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিরোধী দলে গেলে আবারও এক পর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারও সরকার গঠন করেন তিনি এবং ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর দেশ শাসন করেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূত্র ধরে যেভাবে দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা সামাল দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি শাসনের পর জনসম্পৃক্ততার অভাব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং ভুল সিদ্ধান্তগুলোই তার শাসনের ইতি টেনে দেয়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক
কমেন্ট বক্স