, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশের মেরিন সেক্টর

আন্তর্জাতিক মান লঙ্ঘন করে ডিপ্লোমাধারীদের সিডিসি দেওয়ার প্রস্তাব বাতিল চেয়ে ৫ দফা দাবি

  • আপলোড সময় : ০২-০৭-২০২৫ ১১:৩৬:৪৩ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০২-০৭-২০২৫ ১১:৩৮:১৭ পূর্বাহ্ন
আন্তর্জাতিক মান লঙ্ঘন করে ডিপ্লোমাধারীদের সিডিসি দেওয়ার প্রস্তাব বাতিল চেয়ে ৫ দফা দাবি বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির লোগো। ছবি- সংগৃহীত
 
বাংলাদেশের মেরিন সেক্টর বর্তমানে এক মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়া সত্ত্বেও, ভুল নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এ খাত তার গুরুত্ব হারাতে বসেছে। বিশেষ করে, ডিপ্লোমা ইন মেরিন টেকনোলজি শিক্ষার্থীদের অফিসার ক্যাডেট সিডিসি (Continuous Discharge Certificate) প্রদানের বিতর্কিত প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশের বিদ্যমান বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন, যা দেশের মেরিন খাতের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
 
মেরিন সেক্টরের বর্তমান সংকট
 
বাংলাদেশের মেরিন সেক্টর থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক আয় অর্জিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এটি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কিন্তু, বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অভাবে এই খাত চরম সংকটে পড়েছে।
 
বিশেষ করে, বিদেশি জাহাজে বাংলাদেশি নাবিকদের কাজ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক জটিলতা এবং ভিসা সমস্যার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে, অনেক নতুন সিডিসিপ্রাপ্ত মেরিনার, বিশেষ করে ক্যাডেট ও রেটিং পর্যায়ের, বর্তমানে বেকার হয়ে পড়েছেন। আগামী মাসগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের মেরিন সেক্টরের জন্য এক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
 
ডিপ্লোমাধারীদের সিডিসি বিতর্ক: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন
 
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, মেরিন টেকনোলজি ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি পাস ডিপ্লোমাধারী শিক্ষার্থীদের অফিসার ক্যাডেট পর্যায়ে সিডিসি প্রদান করা হোক। কিন্তু, এই প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং দেশের বিদ্যমান বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
 
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন: ডিপ্লোমা ইন মেরিন টেকনোলজি একটি এসএসসি-ভিত্তিক শিক্ষা কর্মসূচি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অফিসার ক্যাডেট হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় STCW কোড A-III/1 অনুযায়ী অনুমোদিত প্রশিক্ষণ নয়।
 
আইনগত ত্রুটি: বাংলাদেশ মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ এবং নৌ অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত বিধি অনুযায়ী, ডিপ্লোমা ইন মেরিন টেকনোলজির কোর্স মার্চেন্ট মেরিন শিক্ষায়তনের অনুমোদন, প্রশিক্ষণ মূল্যায়ন এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিধি ২৬ এর ধারা ৪ অনুযায়ী অনুমিত নয়।
 
পরীক্ষক ও প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা: আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, প্রধান পরীক্ষক, পরীক্ষক এবং প্রশিক্ষকদের অবশ্যই বৈদেশিক জাহাজে চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং অনুমোদিত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে। ডিপ্লোমা ইন মেরিন টেকনোলজির ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হচ্ছে।
 
বৈষম্য: মাত্র ৬ মাসের ট্রেনিং করে ডিপ্লোমা ইন মেরিন টেকনোলজির শিক্ষার্থীদের অফিসার সিডিসি প্রদান করা অন্যান্য যোগ্য ক্যাডেটদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্য, যা বাংলাদেশের মেরিন সেক্টরের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে।
 
এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মেরিন সেক্টরের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। এর ফলে, বাংলাদেশ IMO-এর হোয়াইট লিস্ট থেকে বাদ পড়তে পারে, আন্তর্জাতিক ম্যানিং এজেন্সিগুলোর আস্থা হারাবে, এবং সামগ্রিকভাবে দেশের মেরিন খাতের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ধ্বংস হবে। অতীতে ফিলিপাইনস এবং ভারত অনুরূপ ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে তাদের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়।
 
সংকট সমাধানে ৫ দফা দাবি
 
বাংলাদেশের মেরিন পেশাজীবীরা এই সংকট সমাধানে ৫ দফা যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেছেন,
 
১. ডিপ্লোমাধারীদের ক্যাডেট সিডিসি দেওয়ার প্রস্তাব বাতিল: মেরিন টেকনোলজি ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমাধারীদের ক্যাডেট সিডিসি দেওয়ার প্রস্তাব অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং নৌ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
২. চাহিদভিত্তিক কোটা নির্ধারণ: ক্যাডেট ও রেটিং রিক্রুটমেন্ট বন্ধ করে চাহিদাভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করতে হবে। পূর্ববর্তী ব্যাচের শতভাগ অনবোর্ড না হলে নতুন ব্যাচ রিক্রুট বন্ধ করতে হবে।
 
৩. ভিসা সমস্যা ও বিদেশি চাকরির বাজারে প্রবেশাধিকার: ভিসা সমস্যা সমাধান ও বিদেশি চাকরির বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
 
৪. অবৈধ লেনদেন বন্ধ: নাবিক প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের অবৈধ লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
 
৫. ক্যাপ্টেন মাহবুবের মুক্তি: ভেনিজুয়েলায় বন্দি ক্যাপ্টেন মাহবুবকে দ্রুত মুক্ত করে আনতে হবে।
 
প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ
 
বাংলাদেশের মেরিন সেক্টর কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি হাজারো দক্ষ তরুণের কর্মসংস্থানের প্রতীক এবং দেশের গৌরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এর মান ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেরিন পেশাজীবীরা মাননীয় উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, প্রত্যেক নাবিক একেকজন অঘোষিত রাষ্ট্রদূত। তাই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে উপরিউক্ত দাবিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
 
সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব এই খাতের সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, যাতে বাংলাদেশের মেরিন সেক্টর দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
​বিশ্বকাপ নাটকে নতুন মোড়, টি-২০ বিশ্বকাপে এখনো  বাংলাদেশের সুযোগ!

​বিশ্বকাপ নাটকে নতুন মোড়, টি-২০ বিশ্বকাপে এখনো বাংলাদেশের সুযোগ!