ফেনী জেলায় টানা বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং এসব নদীর অন্তত ২১টি পয়েন্টে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে প্রবল স্রোতে পানি ঢুকে পড়েছে জনবসতিতে। এতে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলায় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত দেড় লক্ষাধিক মানুষ।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলার ছয়টি উপজেলায় ১৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৯টিতে ইতোমধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন সাত হাজারেরও বেশি মানুষ। বন্যার্তদের সহায়তায় সেনাবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) দুপুর ১টা থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা স্পিডবোটসহ দুর্গম এলাকায় পৌঁছে উদ্ধারকাজ পরিচালনা শুরু করেন।
সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানায়, পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার দুর্গত এলাকায় পর্যায়ক্রমে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। স্পিডবোট, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিয়ে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। ছাগলনাইয়ার দক্ষিণ সতর এলাকার বাসিন্দা রবিউল হাসান বলেন, প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা পানির নিচে চলে যাচ্ছে। পানির তীব্র স্রোতে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। একই এলাকার নজরুল ইসলাম বলেন, রাস্তাঘাটে পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কেও সমস্যা হচ্ছে। এখনো আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে শুকনো খাবার বা অন্য কোনো সহায়তা পাইনি।
দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা জহিরুল রাজু জানান, গেল বছরের ক্ষতি এখনো সামাল দিতে পারিনি, এরই মধ্যে আবারও ঘরের সব কিছু পানিতে ভেসে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির চাপ কমতে শুরু করলেও ভাঙা বাঁধের অংশ দিয়ে পানি ঢুকে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় নদীর পানি বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
ফেনী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, জেলায় টানা চার দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবারও হালকা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে নদীর পানি বিপৎসীমার ২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে ভাঙনের স্থান দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি ঢুকে প্লাবিত করছে নতুন নতুন এলাকা। পানি কমার পর বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হবে।
জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ছয় উপজেলায় ত্রাণ সহায়তার জন্য সাড়ে ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বন্যার কারণে অনেক এলাকা বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। সড়কপথেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্যাকবলিত মানুষরা বলছেন, প্রতিবছর জুলাই-আগস্ট মাসে বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান নেই। তারা দ্রুত ও কার্যকর বাঁধ মেরামত এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন।